Header Ads

Header ADS

নুরের কাছে এক মেয়ের হৃদয় নিংড়ানো চিঠি

প্রিয় নূর!

কেমন আছো? তুমি ভালো নেই এটা পুরো দেশ জানে।হাসপাতালের সফেদ শয্যায় শুয়ে কেউ ভালো থাকতে পারে না, চারপাশের রক্তাক্ত মুখচ্ছবি দেখে,আর্ত
চিৎকার শুনে,বীভৎসতা দেখে নূর ভালো নেই,এটা খুব সহজেই অনুমেয়।তবুও কুশল বিনিময় করা চিঠির নিয়মের মধ্যে পড়ে কিনা,তাই নিয়ম রক্ষা করতে গিয়ে পাষাণে র মতো জিজ্ঞেস করে বোধহয় দগ্ধ ক্ষতটা আরেকবার জাগিয়ে তুললাম।অপরাধ মার্জনা করো হে।

জানো যেদিন তোমার উপর ওরা ঝাপিয়ে পড়ল সদলবলে,সেদিন থেকে আমি ভালো নেই।তোমার অসুস্থ,মলিন মুখচ্ছবি বুকের ভেতর সজোরে আঘাত করে চলছে তবুও তোমার এই বিপদে তোমার কাছে একবার যেতে পারছি না অথচ এই তুমি আমাদের জন্যই আজ হাসপাতালে শুয়ে কাতরাচ্ছো।

দুটো রজনীগন্ধার স্টিক আর চারটে কমলা লেবু তোমার শিয়রে রেখে আসব ভেবে যেই পা বাড়াই,কে যেন সামনে এসে পথ রোধ করে দেয় ঠিক বুঝতে পারি না।অগত্যা ইচ্ছে জলাঞ্জলি দিয়ে অকৃতজ্ঞের মতো আরামে ঘরে বসে বিশ্বকাপ বিশ্বকাপ করে দিন কাটাচ্ছি।এই অধর্ম ঈশ্বর সইবেন কিনা জানি না তবে তুমি ক্ষমা করে দিও এই পাপীকে।

সমস্ত অসহায়ত্ব,ব্যথা,বেদনা আর অব্যক্ত ভাষাগুলো কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে হৃদয়ের এক কোণে।কার কাছে অভিযোগ জানাব,কেউ তো নেই যিনি বুঝবেন।

তোমার খুব অভিমান হচ্ছে,তাই না নূর? আইন শৃঙখলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর, তোমাকে যারা নির্মমভাবে মারধর করল তাদের উপর,যারা তোমাকে বাঁচাতে চেষ্টা না করে চেয়ে চেয়ে দেখল,মুখে কুলুপ এঁটে থাকা ধ্বজভঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপর,যারা মধ্যরাতে তোমাকে হাসপাতাল থেকে দুরদুর করে তাড়িয়ে দিল,সর্বোপরি যাদের তুমি পরম ভরসায় সহযোদ্ধা বলতে, যাদের অধিকার আদায়ের জন্য তুমি সব দ্বিধা,বাধা পায়ে দলে সামনে গিয়েছিলে নেতৃত্বে দানে তাদের এমন নীরব ভূমিকা দেখে অভিমানে নীল হওয়াটা ভীষণ স্বাভাবিক।আমি তোমার এই অনুভূতির উপর পূর্ণমাত্রায় শ্রদ্ধাশীল।

তাছাড়া অভিমান কী আমার কম হচ্ছে বলো?এই দেশ কী চেয়েছিলাম আমরা যেখানে ছেলেদের অধিকার আদায়ের জন্য মার খেয়ে শয্যাশায়ী হতে হবে,হাতুড়ি পেটা করে পা থেঁতলে দেয়া হবে? দেশ ত্যাগ করে কেউ কেন আর ফিরে আসে না,তা এবার ভালো করে টের পাচ্ছি।২ তারিখ ক্যাম্পাসে গিয়ে ঢাকা মেডিকেল গেট থেকে বুনোদের তাড়া খেয়ে টিএসসি এসে মুখ ভার করে বসে ছিলাম,সঙ্গে ছিল আরো কজন দুঃখী প্রাণী ।লাইব্রেরীর সামনে গিয়ে বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল।ইচ্ছে হচ্ছে সব ছেড়ে কোথাও পালিয়ে যাই।

তুমি হয়তো এতক্ষণে জেনে থাকবে তোমার অনেক ভাই রাস্তায় নেমে রক্তাক্ত হয়েছে, গুরুতর জখম হয়েছে,পা হারিয়েছে।তোমার বোনেরা লাঞ্ছিত হয়েছে।তারা কিন্তু তোমার কথা অনুযায়ী রাস্তায় নেমেছে।আর যারা নামছে না,আসলে কথাটা হবে যারা নামতে পারছে না,ওরা কিন্তু ভেতরে গুমড়ে মরছে ঠিকই।কেন পারছে না তা তোমার অজানা নয়।

তবে এটাও ঠিক তোমার গর্বের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে গোলাম আজমরাও কিন্তু পড়াশোনা করেছে।সবার চেতনা এক হবে না,সবাই নূর,রাশেদ নয়।সবাই শুভ চেতনার সরোবরে শুদ্ধ হতে পারে না নূর, কেউ কেউ বাহুবলে বিশ্বাসী হয়ে বেঁচে রবে তেলাপোকার মতো এবং কোনোদিন জানতেও পারবে না কেমন একটা অর্থহীন জীবন কাটিয়ে দিল যুগভরে ।

আমার স্পষ্ট মনে আছে তুমি আমাদের বারবার বলেছিলে “কোনো কিছুই যেন কারো দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়,আমরা কাউকে আঘাত করার জন্য রাস্তায় নামিনি, আমরা একটা যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য নেমেছি”।তোমাদের শ্রেষ্ঠত্ব এখানেই।

তুমি এই আন্দোলনে নেতৃত্ব এসে ভুল করে ছো,এমনটি যেন একবারও ভেবো না নূর।অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে গেলে অনেক বাধা আসে,তোমার প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধু কী কম বাধার মুখোমুখি হয়েছেন?তাই বলে কি তিনি কি হাল ছেড়েছেন?অভিমান করেছে ন? তিনি হাল ছেড়ে দিলে কি আজ আমরা স্বাধীন দেশ পেতাম? পেতাম না।

আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের নূরও ঠিক ইস্পাতের মতো অবিচল থাকবে।অবশ্য এসব কথা তোমাকে বলা আর উত্তাল সাগরকে পদ্ম দিঘী যখন ‘ঢেউ’ চেনাতে চায় অথবা চিতাকে কচ্ছপ যখন ‘দৌড়’ নিয়ে জ্ঞান দেয়,ব্যাপারটা সেরকম হয়ে যায়।

তোমার নাম নূর! কে রেখেছিলেন এমন স্বার্থক নামটি?তোমার জন্মের সাথেসাথেই তোমার অমন মায়াময় চোখদুটি থেকে তেজোদৃপ্ত রশ্মি ঠিকরে ঠিকরে বের হচ্ছিল বুঝি?আর তা দেখেই তোমার রত্নগর্ভা মা ঠিক করে ফেললেন তোমার নাম হবে ‘নূর’।

আর তুমি কী অসাধারণ ভাবেই না তোমার নামের স্বার্থকতা প্রমাণ করে যাচ্ছো।তোমার মায়ের চরণতলে শতসহস্র প্রণাম।

নূর মানে আলো, জ্যোতি, নূর মানে দীপ শিখা।কী দারুণভাবে তোমার নাম আর তুমি এক হয়ে মিশে আছো ঠিক পাহাড়ের বুকে যেমন মিশে আছে হিম শীতল ঝর্না।তুমি এই দিশেহারা কুটিরে নিকষ অাঁধারে জ্বলন্ত প্রদীপই নও,তুমি বহুকাল ধরে মেঘে ঢাকা কালো আকাশে উদীয়মান রক্তিম সূর্য।

তুমি উলকা,তুমি সমুদ্রের বুকে তেজো দৃপ্ত ঝলমলে রোদ।তুমি হাজার প্রাণে আশা জাগানিয়া নবপ্রাণ।তুমি কালজয়ী ‘পথের দাবি’ র সচেতন সব্যসাচী।তুমি মহাভারতের সত্যের প্রতিমূর্তি যুধিষ্ঠির,তুমি হার না মানা অর্জুন।তুমি দমকা হাওয়ায় নিভে না যাওয়া আলোকবর্তিকা, তুমি পুনর্জন্ম নেয়া নতুন রাজু কিংবা রুমি,তুমি বিপ্লবী ক্ষুদিরাম।তুমি শেরে বাংলার উত্তরসূরী,তুমি বঙ্গবন্ধুর চেতনায় উজ্জীবিত মহান সেনা।

তুমি ইংরেজি বিভাগের মেধাবী ছাত্র।নিজের মতো করে নিশ্চয় একটা জব জুটিয়ে রুটিরুজির ব্যবস্থা করতে তোমার অসুবিধা হতো না।তুমিও তোমার আর দশজন ক্লাসমেটের মতো সবকিছু থোরাই কেয়ার করে নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে পারতে,দেশের বাইরে চলে যেতে পারতে। অথচ নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে তুমি হাজারো ছাত্রের জীবিকা নিয়ে উঠেপড়ে লাগলে।

আর এর শেষ পরিণাম অসুস্থ শরীরে এখন তুমি এই হাসপাতাল ছেড়ে অন্য হাসপাতালে ছূটে বেড়াচ্ছ চিকিৎসার জন্য।তোমার সহযোগী রাশেদ,ফারুকদের আটক করে রাখা হলো অথচ তারা নির্দোষ।কী করে এই ঋণ শুধব বলে দিতে পারো?কাঁধে কিছু একটা চেপে আছে টের পাচ্ছি কদিন ধরে,তোমরা যে উদ্দেশ্যে এই বেদনা সয়ে যাচ্ছ সেই উদ্দেশ্য পূরণ হলে হয়তো কাঁধটা কিছুটা হলেও হালকা হবে।সেদিনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছি।

একটা কথা লিখে এবারের মতো শেষ করছি”Karma comes after everyone eventually.”

অনেক কিছু বলার ছিল,বলা হলো না। কোন ভরসায় বলব বলো?ক্যাম্পাসে তো আমাদের অবস্থান কাঙালের চেয়ে কম কিছু নয়,এ কথা এখন তোমার চেয়ে ভালো আর কেই বা জানে! সত্যি বলতে নিজেকে নুলো ভিখিরিটার চেয়েও বেশি অসহায় লাগছে,জানো?

আমি শুধু বলতে চাই তুমি দ্রুত সুস্থ হয়ে ফিরে এসো।এই প্রার্থনাটুকু ছাড়া আর এই অধমের যে কিছুই করার নেই।ক্ষমা করো নূর।

ইতি-
এক অসহায় প্রাণী..

Blogger দ্বারা পরিচালিত.